ব্লগ·১ অক্টোবর, ২০২৬·8 মিনিট
অনলাইন ব্যবসা কিভাবে শুরু করবো: ৭টি ধাপ (২০২৬)
সংক্ষেপে উত্তর: অনলাইন ব্যবসা শুরু করতে বড় পুঁজি লাগে না। লাগে একটা মোবাইল, একটা ঠিকঠাক প্রোডাক্ট, একটা ফেসবুক পেজ বা WhatsApp নম্বর, আর একটা কুরিয়ার অ্যাকাউন্ট। সবচেয়ে জরুরি হলো দাম ঠিক করার আগে কুরিয়ার চার্জ, COD চার্জ আর ফেরত পার্সেলের খরচ হিসাবে ধরা। নিচে ৭টা ধাপে পুরোটা দিলাম।
এই লেখায় যত কুরিয়ার চার্জ আছে, সব ১ অক্টোবর ২০২৬-এ কুরিয়ারগুলোর নিজেদের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া। লাভের যে হিসাবগুলো আছে, সেগুলো উদাহরণ। নিজের প্রোডাক্টের দাম বসিয়ে আবার হিসাব করে নিন।
অনলাইন ব্যবসা করতে কি কি লাগে?
- একটা স্মার্টফোন আর ইন্টারনেট
- বিক্রি করার মতো প্রোডাক্ট, আর একজন ভরসার সাপ্লায়ার
- একটা ফেসবুক পেজ, আর আলাদা একটা WhatsApp Business নম্বর
- অন্তত একটা কুরিয়ারের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট (স্টেডফাস্ট, পাঠাও বা রেডএক্স)
- অ্যাডভান্স নেওয়ার জন্য একটা বিকাশ বা নগদ নম্বর
- প্যাকেজিংয়ের জিনিস: পলি, বক্স, টেপ
- হিসাব রাখার একটা খাতা বা গুগল শীট
কাগজপত্রের কথা শেষে আছে। প্রথম দিনেই সব লাগবে না।
ধাপ ১: কোন প্রোডাক্ট দিয়ে শুরু করবেন?
নতুনদের জন্য ভালো প্রোডাক্টের কয়েকটা লক্ষণ:
- হালকা। প্যাকেটসহ ০.৫ কেজির নিচে থাকলে প্রায় সব কুরিয়ারেই সবচেয়ে কম চার্জ লাগে। ওজন বাড়লে চার্জও বাড়ে।
- ভাঙে না। কাচের জিনিস বা তরল দিয়ে শুরু করলে ড্যামেজের ঝামেলা বেশি।
- ছবিতে ভালো দেখা যায়। কাস্টমার হাতে ধরে দেখতে পারে না, তাই আসল ছবিই আপনার দোকান।
- আপনি জিনিসটা বোঝেন। কাপড় চিনলে কাপড়, স্কিনকেয়ার বুঝলে স্কিনকেয়ার। কাস্টমারের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন।
- লাভের জায়গা আছে। কুরিয়ার, প্যাকেজিং আর ফেরতের খরচ বাদ দিয়েও যেন লাভ থাকে।
লাইসেন্স ছাড়া ওষুধ বা এমন কোনো পণ্য বিক্রি করবেন না যার জন্য আলাদা অনুমতি লাগে। ২০২১ সালের ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকায় এগুলো নিয়ে নিয়ম আছে।
কোন প্রোডাক্টে খরচ আর রিটার্নের ঝুঁকি কত, এক টেবিলে দেখতে পড়ুন ঘরে বসে অনলাইন ব্যবসার আইডিয়া।
ধাপ ২: দাম কিভাবে ঠিক করবেন?
বেশিরভাগ নতুন সেলার এখানেই ভুল করেন। কেনা দামের সাথে একটা লাভ যোগ করে বিক্রি শুরু করেন, তারপর মাস শেষে দেখেন টাকা নেই। হিসাবটা এভাবে করুন।
উদাহরণ: একটা প্রোডাক্ট ৳৫৫০ টাকায় কিনলেন, বিক্রি করবেন ৳১,০০০ টাকায়। প্যাকেটসহ ওজন ০.৫ কেজি। ঢাকার কাস্টমার থেকে ডেলিভারি চার্জ নিচ্ছেন ৳৮০, ঢাকার বাইরে ৳১৩০। কুরিয়ার স্টেডফাস্ট।
| হিসাব | ঢাকার ভেতরে | ঢাকার বাইরে |
|---|---|---|
| কাস্টমার দিলো (দাম + ডেলিভারি) | ৳১,০৮০ | ৳১,১৩০ |
| স্টেডফাস্ট ডেলিভারি চার্জ | ৳৬৫ | ৳১১৫ |
| COD চার্জ (ডেলিভারি চার্জ বাদে বাকি টাকার ১%) | ৳১০ | ৳১০ |
| আপনার হাতে এলো | ৳১,০০৫ | ৳১,০০৫ |
| কেনা দাম বাদে লাভ (প্যাকেজিং বাদ দেওয়ার আগে) | ৳৪৫৫ | ৳৪৫৫ |
এবার ফেরত পার্সেলের হিসাব। কাস্টমার পার্সেল না নিলে আপনি এক টাকাও পান না, কিন্তু কুরিয়ার চার্জ ঠিকই কাটে। স্টেডফাস্টের শর্তে লেখা আছে তারা রিটার্ন পার্সেলের জন্য আলাদা চার্জ নেয় না, তবে পাঠানোর ৳১১৫ চলে যায়। পাঠাওতে ঢাকার বাইরের অর্ডার ফেরত এলে ডেলিভারি চার্জের ৫০% রিটার্ন চার্জ যোগ হয়।
ধরুন ১০টা পার্সেলের ২টা ফেরত এলো। ৮টা ডেলিভারিতে লাভ ৳৩,৬৪০ (৮ × ৳৪৫৫)। ২টা ফেরতে ঢাকার বাইরের হিসাবে লস ৳২৩০। তার ওপর ফেরত আসা প্রোডাক্ট অনেক সময় আর নতুনের মতো বিক্রি করা যায় না। তাই দাম ঠিক করার সময় ফেরতের খরচও ধরে রাখুন। তিন কুরিয়ারের পুরো চার্জ লিস্ট আর ডেলিভারি চার্জ ঠিক করার নিয়ম পাবেন আমাদের কুরিয়ার চার্জ গাইডে (ইংরেজিতে)।
ধাপ ৩: ফেসবুক পেজ আর WhatsApp Business সেটআপ
- পেজের নাম ছোট আর বানান সহজ রাখুন, যেন কাস্টমার সার্চ করে খুঁজে পায়।
- About অংশে লিখুন আপনি কী বিক্রি করেন, ঢাকার ভেতরে আর বাইরে ডেলিভারি চার্জ কত, কয় দিনে ডেলিভারি হয়, আর ফেরত বা এক্সচেঞ্জের নিয়ম কী। বাংলায় লিখুন।
- আলাদা একটা নম্বরে WhatsApp Business খুলুন। "দাম কত?", "ডেলিভারি চার্জ কত?" এসব প্রশ্নের উত্তর Quick Reply হিসেবে সেভ করে রাখুন।
- প্রতিটা প্রোডাক্টের আসল ছবি তুলুন, দিনের আলোয়। সাপ্লায়ারের ছবি দিলে কাস্টমার ভুল বুঝতে পারে, আর ফেরত বাড়ে।
WhatsApp-এ অর্ডার নেওয়া থেকে কনফার্ম করা পর্যন্ত পুরো নিয়ম আছে আমাদের WhatsApp-এ বিক্রির গাইডে।
ধাপ ৪: কুরিয়ার অ্যাকাউন্ট খুলুন
স্টেডফাস্ট (steadfast.com.bd), পাঠাও (merchant.pathao.com) আর রেডএক্স (redx.com.bd), তিনটারই ওয়েবসাইটে মার্চেন্ট হিসেবে সাইনআপ করা যায়। পিকআপের ঠিকানা আর COD-র টাকা কোথায় নেবেন, সেটা দিতে হয়। স্টেডফাস্ট জানিয়েছে তারা ব্যাংক, বিকাশ, নগদ, রকেট বা ক্যাশে পেমেন্ট দেয়।
অক্টোবর ২০২৬-এ ঢাকার ভেতরে ০.৫ কেজির পার্সেলে পাঠাও ৳৬০, স্টেডফাস্ট আর রেডএক্স ৳৬৫ নেয়। ঢাকা থেকে বাইরের জেলায় পাঠাও ৳১১০, স্টেডফাস্ট ৳১১৫, রেডএক্স ৳১২০। পার্থক্য অল্প। তাই প্রথম মাসে একটা কুরিয়ার দিয়ে শুরু করুন, আর কোনটায় কত পার্সেল ফেরত আসছে তা লিখে রাখুন।
ধাপ ৫: পেমেন্ট নেবেন কিভাবে, COD নাকি বিকাশ অ্যাডভান্স?
বেশিরভাগ কাস্টমার ক্যাশ অন ডেলিভারি চায়, কারণ তারা আগে জিনিস দেখতে চায়। পুরোপুরি অ্যাডভান্স চাইলে অনেক অর্ডার হারাবেন। আবার সব অর্ডার COD-তে নিলে ফেক অর্ডার বাড়ে। অনেক সেলার মাঝামাঝি একটা নিয়ম চালান: ঢাকার ভেতরে COD, আর ঢাকার বাইরে শুধু ডেলিভারি চার্জটা বিকাশে অ্যাডভান্স।
কোন অর্ডারে কতটা অ্যাডভান্স নেবেন, তার পুরো টেবিল আছে আমাদের COD বনাম বিকাশ অ্যাডভান্স গাইডে (ইংরেজিতে)।
ধাপ ৬: প্রথম অর্ডার কিভাবে পাবেন?
- চেনা মানুষ দিয়ে শুরু করুন: বন্ধু, আত্মীয়, অফিস বা এলাকার মানুষ।
- প্রতিটা পোস্টে দাম আর ডেলিভারি চার্জ লিখুন। তাহলে কাস্টমারকে ইনবক্সে জিজ্ঞেস করতে হয় না। ২০২১ সালের নির্দেশিকাতেও দাম আর ডেলিভারি চার্জ দেখাতে বলা আছে।
- প্রথম কাস্টমারদের বলুন পণ্যের ছবিসহ রিভিউ দিতে।
- নিয়ম করে পোস্ট দিন, অল্প হলেও প্রতিদিন।
- বুস্ট করুন তখনই, যখন পেজে কিছু রিভিউ আর ঠিকঠাক ছবি আছে।
প্রোডাক্ট বাড়লে পুরনো পোস্ট নিচে চলে যায়, কাস্টমার আর খুঁজে পায় না। তখন সব প্রোডাক্ট এক লিংকে রাখলে কাজ সহজ হয়। Kommercly দিয়ে ফোন থেকে ছবি, নাম আর দাম দিয়ে, বা একটা গুগল শীট থেকে, yourname.kommercly.com ঠিকানায় একটা স্টোর বানানো যায়। কাস্টমার অর্ডার করলে প্রোডাক্ট, ঠিকানা আর মোট দামসহ অর্ডারটা আপনার WhatsApp-এ আসে। ফ্রি প্ল্যানে ৩০টা পর্যন্ত প্রোডাক্ট রাখা যায়, কমিশন ০%। ফোন থেকে কিভাবে বানাবেন তা আছে সেটআপ গাইডে।
ধাপ ৭: অর্ডার থেকে ডেলিভারি পর্যন্ত
- অর্ডার এলে WhatsApp-এ কনফার্মেশন মেসেজ দিন: প্রোডাক্ট, মোট টাকা, ডেলিভারির দিন। কাস্টমার "হ্যাঁ" বললে তবেই পাঠান।
- প্যাকেট করে ওজন দেখে নিন, যেন কুরিয়ারের হিসাবের সাথে মেলে।
- কুরিয়ারে পার্সেল বুক করুন, আর কাস্টমারকে ট্র্যাকিং কোড পাঠান।
- হিসাবের শীটে প্রতিটা অর্ডারের জন্য এক লাইন রাখুন: তারিখ, কাস্টমারের নম্বর, প্রোডাক্ট, দাম, কুরিয়ার, ডেলিভারি হলো নাকি ফেরত এলো।
- মাস শেষে দেখুন ১০০টা পার্সেলের কয়টা ফেরত এসেছে। এই সংখ্যাটাই বলে দেবে আপনার ফিল্টার ঠিক আছে কি না।
যারা বারবার পার্সেল ফেরত দেয়, তাদের নম্বর আলাদা করে লিখে রাখুন। পরের বার তাদের কাছ থেকে অ্যাডভান্স নিন।
ট্রেড লাইসেন্স আর DBID কখন লাগবে?
অনলাইনে বিক্রি করলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের DBID (ডিজিটাল বিজনেস আইডেন্টিটি) নেওয়ার কথা। এটা ফ্রি, আর ২০২২ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী NID আর ফেসবুক পেজের লিংক দিয়েই আবেদন করা যায়। ট্রেড লাইসেন্স আলাদা, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিতে হয়, ফি এলাকা আর ব্যবসার ধরন অনুযায়ী আলাদা। কোনটা আগে করবেন, কী কী কাগজ লাগে, তা বিস্তারিত আছে আমাদের ট্রেড লাইসেন্স আর DBID গাইডে (ইংরেজিতে)।
সংক্ষেপে প্রশ্ন-উত্তর
অনলাইন ব্যবসা করতে কি কি লাগে?
শুরু করতে লাগে একটা স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, বিক্রি করার মতো একটা প্রোডাক্ট, একটা ফেসবুক পেজ বা WhatsApp Business নম্বর, আর একটা কুরিয়ার মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট। অ্যাডভান্স নেওয়ার জন্য একটা বিকাশ বা নগদ নম্বর রাখুন। হিসাবের জন্য একটা খাতা বা গুগল শীট। ট্রেড লাইসেন্স আর DBID পরে করলেও চলে, তবে দেরি করবেন না।
কত টাকা দিয়ে অনলাইন ব্যবসা শুরু করা যায়?
নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক নেই। ফেসবুক পেজ, WhatsApp Business আর কুরিয়ার অ্যাকাউন্ট খুলতে টাকা লাগে না। আসল খরচ হলো প্রথম স্টক, প্যাকেজিং আর কিছু ফেরত পার্সেলের লস। প্রথমে অল্প স্টক কিনুন, বা অর্ডার পেলে তবেই কিনবেন এমন সাপ্লায়ার খুঁজুন। বিক্রি বুঝে স্টক বাড়ান।
অনলাইন ব্যবসার জন্য কি ট্রেড লাইসেন্স লাগে?
২০২২ সালের DBID নির্দেশিকা নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের রিপোর্ট বলছে, NID আর ফেসবুক পেজ বা ওয়েবসাইটের লিংক দিয়েই DBID-এর আবেদন করা যায়, ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই। DBID ফ্রি। ট্রেড লাইসেন্স আলাদা জিনিস, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা বা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিতে হয়। ব্যবসা দাঁড়িয়ে গেলে দুটোই করে ফেলুন।
কোন কুরিয়ার দিয়ে শুরু করবো?
স্টেডফাস্ট, পাঠাও আর রেডএক্স, তিনটারই ওয়েবসাইটে মার্চেন্ট সাইনআপ আছে। ঢাকার ভেতরে ০.৫ কেজির পার্সেলে অক্টোবর ২০২৬-এ চার্জ ৳৬০ থেকে ৳৬৫। দামের পার্থক্য অল্প, তাই রিটার্ন চার্জ আর পেমেন্ট কবে পাবেন সেটাও দেখুন। এক মাস চালিয়ে দেখুন কোন কুরিয়ারে পার্সেল কম ফেরত আসে।
প্রথম অর্ডার কিভাবে পাবো?
প্রথম অর্ডার সাধারণত আসে চেনা মানুষ থেকে: বন্ধু, আত্মীয়, এলাকার মানুষ। তাদের কাছে পেজটা শেয়ার করুন, আর প্রথম কয়েকজন কাস্টমারকে পণ্যের আসল ছবি দিয়ে রিভিউ দিতে বলুন। প্রতিটা পোস্টে দাম আর ডেলিভারি চার্জ লিখুন। ইনবক্সে দ্রুত উত্তর দিন। এরপর বুস্ট করুন, আগে না।
তথ্যসূত্র (১ অক্টোবর ২০২৬-এ দেখা): স্টেডফাস্টের রেট ক্যালকুলেটর আর শর্তাবলি, পাঠাও কুরিয়ারের রেট কার্ড, রেডএক্সের প্রাইসিং প্ল্যান, দ্য ডেইলি স্টার (জুলাই ২০২১ ও জুলাই ২০২২)।
ফোন থেকেই অনলাইন স্টোর, অর্ডার আসবে WhatsApp-এ
ফ্রি প্ল্যান, কোনো কার্ড বা কোডিং লাগবে না। ফোনে ছবি তুলে প্রথম প্রোডাক্ট যোগ করুন।
ফ্রি স্টোর বানানKommercly দিয়ে বানানো লাইভ স্টোর দেখুন:Dobby (opens in a new tab)Stellify (opens in a new tab)
